রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) গবেষকেরা এমন এক নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, যাতে মাত্র ২৫০ টাকায় এবং এক ঘণ্টারও কম সময়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে ফসলে বিষ আছে কি না। এতে বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় খরচ কমবে প্রায় ৪০ গুণ, যা মাঠপর্যায়ে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বড় পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রোববার (১০ মে ২০২৬) বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফারেন্স কক্ষে এই গবেষণার চূড়ান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেমের (সাউরেস) অর্থায়নে কৃষি রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুল কাইউম গবেষণাটি পরিচালিত করেছেন।
গবেষকেরা জানান, নতুন এই পদ্ধতিটি মূলত ‘অ্যাসিটাইলকোলিনস্টেরেজ’ (AChE) নামক একটি এনজাইমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি একটি ‘কালোরিমেট্রিক’ বা বর্ণভিত্তিক পদ্ধতি, যেখানে কীটনাশকের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে নমুনার রঙের পরিবর্তন ঘটে। যদি পরীক্ষায় দেখা যায় এনজাইমের কার্যকারিতা ৫০ শতাংশের বেশি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তবে বুঝতে হবে ওই সবজি বা পানিতে কীটনাশকের উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত পদ্ধতিতে (GC-MS বা LC-MS) প্রতিটি নমুনা পরীক্ষায় যেখানে ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে এই পদ্ধতিতে খরচ হবে মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। সময় লাগবে মাত্র ৪০ থেকে ৬০ মিনিট। ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় এই পদ্ধতির নির্ভুলতার মাত্রা বৈজ্ঞানিকভাবে অত্যন্ত উচ্চমানের (R² = 0.997) বলে প্রমাণিত হয়েছে।
গবেষণা প্রকল্পের প্রধান গবেষক ও কৃষি রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুল কাইউম জানান, “আমরা টমেটো, বেগুন, পালং শাক, করলা, শসা ও বাঁধাকপিসহ বিভিন্ন সবজি এবং সেচের পানি ও পুকুরের পানির নমুনায় সফলভাবে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করেছি।”
তিনি বলেন, “বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতিগুলো ব্যয়বহুল হওয়ায় সাধারণের নাগালের বাইরে। আমাদের এই পদ্ধতিটি সহজে বহনযোগ্য। ভবিষ্যতে আমরা এটিকে একটি ‘র্যাপিড ডিটেকশন কিট’ (RDK) ও কাগজের স্ট্রিপে (পেপার-বেসড) রূপান্তরের কাজ করছি, যাতে কৃষক বা সাধারণ মানুষ নিজেই খাবারের নিরাপত্তা যাচাই করতে পারেন।”
সাউরেস পরিচালক অধ্যাপক ড. এফ এম আমিনুজ্জামান বলেন, “অর্গানোফসফরাস জাতীয় কীটনাশক জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এটি মানুষের স্নায়ুতন্ত্র, লিভার ও কিডনির ক্ষতি করে। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল লতিফ এই উদ্ভাবনকে যুগান্তকারী উল্লেখ করে বলেন, “এটি একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী গবেষণা। মাঠপর্যায়ে এর সফল প্রয়োগ কেবল নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাই নিশ্চিত করবে না, বরং সরকারি পর্যায়ে কার্যকর কীটনাশক নীতিমালা প্রণয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
নাহীদ